শূন্য হাতে শুরু করে মাসে আয় ২০-২৫ লাখ টাকা

শখের বসে কাপড়ে নকশি তোলার কাজ শিখেছিলেন। কে জানতো এটিই তার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠবে। যে নারী কয়েক বছর আগেও ঘরের বাইরে বের হতেন না, সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো নিয়ে চোখেমুখে অন্ধকার দেখেছিলেন, সেই নারী মাত্র ৯ বছরে হয়ে উঠলেন উদ্যোক্তা, ঘুরছেন দেশ-বিদেশে। যার মাসে আয় ২০-২৫ লাখ টাকা।

জীবন-সংগ্রামের এই গল্পটা যশোর শহরের সার্কিট হাউজপাড়া এলাকার সালমা ইসলামের। বলা চলে লড়াকু এক যোদ্ধা। যিনি নানা ঘাত-প্রতিঘাত জয় করেছেন, সমাজের বাধা-বিপত্তি ঠেলে জয়ের মশাল জ্বালিয়েছেন।

সার্কিট হাউজপাড়া জিলা স্কুলের পেছনে তার বাড়ি। সেখানে গড়েছেন রকমারি হস্তশিল্পের শপ। যেখানে বিক্রি করা হয় হাতে তৈরি শাড়ি, থ্রিপিস, ওয়ান পিস, নকশিকাঁথা, ওয়ালমেট, কুশন ও কাভারসহ নানা সামগ্রী। তার প্রতিষ্ঠানের জন্য সেলাইয়ের কাজ করছেন চার শতাধিক কর্মী। বর্তমানে বাড়ির পাশে নির্মাণ করছেন দোতলা একটি মিনি গার্মেন্ট; যেখানে কর্মসংস্থান হবে আরও শতাধিক মানুষের।

যেভাবে শুরু হস্তশিল্পের কাজ 
১৯৮৮ সালে সালমা ইসলামের বিয়ে হয়। তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বিয়ের পর এসএসসি পাস করেন। সালমা ইসলাম বলেন, ‘১৯৯৩-৯৪ সালের ঘটনা। শখের বসে কাপড়ে নকশি তোলার কাজ শিখেছিলাম। স্বামীর অগোচরে বাড়িতে বসে নকশি তোলার কাজ করতাম। নিজে ব্যবহারের পাশাপাশি বাইরেও বিক্রি করতাম। এতে হাতখরচ চলতো। বলতে পারেন, শাড়ি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি কিংবা ফতুয়ায় ফুল কিংবা নকশা তোলা আমার শখ ছিল। আজ এটি উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠলো।’

স্বপ্নের দিন, বেদনার বর্ণবিহীন 
২০১৩ সালে সার্কিট হাউজপাড়ার কতিপয় চাঁদাবাজকে চাঁদা না দেওয়ায় সালমা ইসলামের স্বামী নূরুল ইসলাম আজাদকে কুপিয়ে জখম করা হয়।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সালমা ইসলাম বলেন, ‘বিয়ের আগে বা পরে যশোরের বাইরে কোথাও যাইনি। ঘরের বাইরেও যেতাম না। স্বামী গুরুতর আহত হওয়ায় প্রথম তাকে নিয়ে ঢাকায় যাই। যখন স্বামীর চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত তখন সন্ত্রাসীরা বাড়িতে রাতে ইট-পাটকেল মারতো। বাড়ির সামনে পাহারা দিতো। ভাড়াটিয়াদের জোর করে নামিয়ে দিয়েছিল বাড়ি থেকে। সন্তানরা তার নানির সঙ্গে ঘরের কোণে চুপ মেরে বসে থাকতো। স্বামীর চিকিৎসায় ব্যয় হয় সব টাকা-পয়সা। একদম কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ি। এ অবস্থায় ২৩ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর স্বামী মারা যান। তখন জীবনে নেমে আসে অমানিশা।’

ব্যবসা শুরু 
স্বামীর মৃত্যুর পর দিশেহারা হয়ে পড়েন সালমা। তিন মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়েন। বাবার বাড়ি থেকে বাজার করে দিলে সেগুলো খেয়ে সন্তানদের নিয়ে দিনাতিপাত করতেন। ওই সময় বাবা-মা তার সংসার চালিয়ে নিয়েছেন। এভাবে কয়েক মাস যাওয়ার পর কাপড় সেলাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এই কাজের মাধ্যমে উপার্জনের পথ খোঁজেন।
সালমা ইসলাম বলেন, ‘২০১৩ সালে শূন্য হাতে ব্যবসার কাজ শুরু করেছিলাম। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ৩০ হাজার টাকা লোন নিই। শুরু করি হস্তশিল্পের কাজ। প্রথমদিকে শাড়ি, থ্রিপিস, ওয়ান পিস আর নকশিকাঁথার কাজ করতাম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।’

আসতে থাকে বড় বড় হাউজের কাজ 
কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে বড় বড় হাউজের কাজ আসতে থাকে উল্লেখ করে সালমা বলেন, ‘২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের বড় বড় ফ্যাশন হাউজের সঙ্গে কাজ করেছি। তাদের অর্ডার অনুযায়ী শাড়ি, কাপড়, নকশিকাঁথা সরবরাহ করেছি। আড়ং, অঞ্জনস ও নাদুয়া ফ্যাশনসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের কোম্পানি আমার কাছ থেকে চাহিদামতো পণ্য নিতো।’

নিজস্ব আইডেনটিটি 
হস্তশিল্পের কাজ করতে গিয়ে প্রথমদিকে সালমা ইসলামকে বেশ ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশীদের টিপ্পনী, বিধবা একজন নারী কীভাবে কী ব্যবসা করবে, বাড়ির বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতে পারবে কিনা এমন নানা বাধা আসতে থাকে। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ান তিনি। তৈরি হয় নিজস্ব আইডেনটিটি।

সালমা বলেন, ‘নিজের মনেও মাঝেমধ্যে উঁকি দিতো, আমি অমুক বাড়ির মেয়ে, অমুক বাড়ির বউ, এই কাজ করলে কে কি মনে করবে? পরে নিজের সঙ্গে নিজেই যুদ্ধ করি। ভেতর থেকে জবাব আসে, তোমাকে উপার্জন করতে হবে, সন্তানদের পড়াশোনা, খরচ ও সংসার চালাতে হবে। এগুলো কেউ তোমাকে করে দেবে না। নিজের কাজে কোনও লজ্জা নেই। কারও কোনও কথা শোনা যাবে না। একাই সামনে এগোতে হবে।’

যে আমি কখনও বাবার বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির বাইরে যাইনি, সেই আমি দেশের প্রত্যেক জেলা শহরে হস্তশিল্পের মেলায় অংশ নিয়েছি জানিয়ে সালমা বলেন, ‘প্রথমদিকে একটু লজ্জা লাগতো। পরে অবশ্য সব ঠিক হয়ে গেছে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আশপাশের দেশের বিভিন্ন স্পটে মেলা করেছি। মূলত মেলায় বেচাবিক্রি তেমন একটা হয় না। কিন্তু লাভ হয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি হয়। মেলায় অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। পরবর্তীতে দেখা গেছে তারাই আমার বড় পার্টি হয়েছেন।’

মেলা ও ফেসবুকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, নেপাল ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় হয় সালমার। সেসব দেশের নারীরা সালমার কাছ থেকে শাড়ি, কাপড় বা নকশিকাঁথা নিয়ে অনেকে শোরুম করেছেন। কেউ কেউ বাড়িতে রেখে ব্যবসা করছেন।

২০১৭ সালে ভারতের কলকাতায় ও পরে শিলিগুড়িতে হস্তশিল্পের মেলায় অংশ নিয়েছি জানিয়ে সালমা বলেন, ‘অনলাইনে অনেকের কাছে পণ্য পাঠাই। আবার বিদেশের বিভিন্ন মেলায় অংশ নিই। কলকাতায় অ্যাপলিক শাড়ি, জামদানি সেলাই ও যশোর স্টিচসহ বিভিন্ন বুটিক ভালো চলে। তাদের সঙ্গে লেনদেনও ভালো।’

চার শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান 
ধীরে ধীরে ব্যবসার প্রসার বাড়তে থাকে সালমার। সেইসঙ্গে তার রকমারি হস্তশিল্পের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। চারদিক থেকে অর্ডার আসে। সেগুলো সময়মতো তাদের সরবরাহে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হয়। যশোর শহর ও শহরতলী, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, মণিরামপুর উপজেলা ছাড়াও খুলনা ও সাতক্ষীরার বেশ কয়েকটি স্থানের নারী কর্মীরা তার জন্য সেলাইয়ের কাজ করেন। তিনি কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেন কাপড়, ডিজাইন আর সুতা। তারা সেগুলো সেলাই করে পাঠিয়ে দেন। এভাবে অনেক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে তার বাড়িতে বেতনভুক্ত তিন স্থায়ী কর্মী রয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে বাড়ির শোরুম সংলগ্ন স্থানে একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করছেন সালমা।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে মিনি গার্মেন্ট তৈরি হয়ে যাবে জানিয়ে সালমা বলেন, ‘এই গার্মেন্টে আরও শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’

মাসে ২০-২৫ লাখ টাকা আয় 
দেশে এবং দেশের বাইরে রকমারি হস্তশিল্পের পণ্য বিক্রি হয় উল্লেখ করে সালমা বলেন, ‘কেউ কেউ অনলাইনেও কেনেন। একসময়ে নিজের সংসার চালানো নিয়ে সংশয়ে থাকা আমি এখন মাসে ২০-২৫ লাখ টাকা আয় করি। চার শতাধিক কর্মী কাজ করেন। মিনি গার্মেন্ট চালুর পর সেখানে আরও শতাধিক কর্মীর কর্মসংস্থান হবে। তখন আয় আরও বেড়ে যাবে।’

ব্যবসার মৌসুম মূলত দুই ঈদ উল্লেখ করে সালমা বলেন, ‘ঈদ ছাড়াও দুর্গাপূজা, পয়লা বৈশাখে বেশ বেচাকেনা হয়। শূন্য হাতে কাজ শুরুর পর লোন নিয়েছিলাম ৩০ হাজার টাকা। পরে সেই টাকা পরিশোধ করে দিই। এরপর আইডিএলসি ফাইন্যান্স থেকে পাঁচ লাখ, বিডি ফাইন্যান্স থেকে ১৫ লাখ পরে আবার আইডিএলসি থেকে ২০ লাখ টাকা লোন নিই। এখন প্রতিমাসে লোনের কিস্তি দিতে হয় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে এতে কোনও সমস্যা হয় না।’

অর্জন ও পুরস্কার 
হস্তশিল্পের ব্যবসায় নেমে উদ্যোক্তা হয়ে যান সালমা ইসলাম। এরই মধ্যে কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। সবশেষ খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে জয়ীতা- ২০২১-২২ হিসেবে সম্মানিত হন। এর আগে জেলা পর্যায়ে জয়ীতা ২০২০-২১ পুরস্কার পান। এছাড়া এসএমই, বিডি বিডি ফাইন্যান্সসহ কয়েকটি পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে।

সম্প্রতি উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ফর ইনক্লুসিভ গ্রোথ (উইং) প্রকল্পের আওতায় ইউএনডিপি থেকে ৩০ লাখ টাকা পেয়েছেন একটি মিনি গার্মেন্ট কারখানা তৈরির জন্য। ইতোমধ্যে কারখানা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

যা বলছেন সেলাই শিল্পীরা 
যশোর শহরতলীর মুড়লি পূর্বপাড়া এলাকার গৃহবধূ রোজিনা বেগম ও মিতা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিনিধির। তখন মিতার বাড়ির বারান্দায় বসে কাজ করছিলেন সাত জন নারী। তারা শাড়ি ও থ্রিপিসে নকশি করছিলেন।

মিতা বেগম বলেন, ‘সংসারের কাজ শেষে সেলাইয়ের কাজ করি আমরা। গত ১৬ বছর ধরে মূলত শাড়ির ওপরে ফুল বা নকশি সেলাই করি। ভরাট কাজ, আঁচলের কাজের ওপর ভিত্তি করে সময় ও মজুরি নির্ধারণ করা হয়। মাসে একটি ভরাট কাজের শাড়ি সেলাই করতে পারি। এতে দুই হাজার টাকা পাই। হালকা কাজে এক হাজার ৫০০-৬০০ টাকা পাই। সময়ও কম লাগে।’

তিনি বলেন, ‘আমার আয়ের টাকা স্বামী নেন না। নিজের আর সন্তানের জন্য খরচ করি। আয় দিয়ে মা-মেয়ের জন্য বেশকিছু সোনার গয়না বানিয়েছি।’

রোজিনা বেগম বলেন, ‘বছর খানেক হলো সালমা আপার সঙ্গে কাজ করছি। আগে অন্যদের জন্য কাজ করেছি। আপা খুব ভালো মানুষ। লেনদেন খুব ভালো। আমি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় করি।’

সফল নারী উদ্যোক্তা সালমা ইসলাম এখন সচ্ছল। একমাত্র ছেলে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। বিবিএ শেষের পর বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়ে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। তিনি এখন মায়ের ব্যবসা দেখেন। ছোট মেয়ে যশোর সরকারি এমএম কলেজে ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করছেন।

সংগ্রাম করে এতদূর এসেছি জানিয়ে সালমা ইসলাম বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছি। বাবা-মা ছাড়া কাউকে পাশে পাইনি। আজ আমার উন্নতি দেখে একসময় যারা সমালোচনা করতো তারাও এখন পরামর্শ নেন। এলাকায় যেকোনো ভালো কাজের উদ্যোগ নিলে সবাই পরামর্শ করতে আসেন। আমিও সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করছি।’












#উদ্যোক্তা, নারী, তৈরি পোশাক শিল্প,  শূন্য হাতে আয় করার উপায়

No comments:

Post a Comment