আউটসোর্সিং ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার সাথে থাকছে.. গুরুত্বপূর্ণ সফট্ওয়্যার, অনলাইন জগতের বিশেষ খবর, অতিপ্রয়োজনীয় টিপস & ট্রিকস- সহ আরও কিছু আপডেট তথ্য, যা আপনার অনলাইন জীবনকে সমৃদ্ধশালী করতে সহায়ক হবে- উন্মুক্ত ‘সংগ্রহশালা’
মুসলিম সভ্যতা : অবক্ষয়ের কারণ ও সংস্কারের আবশ্যকতা
তারুণ্যের আন্দোলনের কিছু সাড়া জাগানো ছবি
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও বাস্তবতা !
ব্লু হোয়েল: আতঙ্ক নয় সতর্কতা জরুরি
ফেসবুক সতর্কবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই নিজ নিজ বন্ধুদের বিশেষ বার্তা পাঠাচ্ছেন: সাবধান, বাংলাদেশেও পৌঁছে গেছে ব্লু হোয়েল গেম! এ নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে কৌতূহল থেকে জানতে চাইছেন পুরো ব্যাপারটা। কেউ কেউ আতঙ্কও ছড়াচ্ছেন।
আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সতর্ক অবশ্যই থাকা উচিত। বিশেষ করে উঠতি বয়সীদের দিকে খেয়াল রাখা, ‘দেখি কী হয়’-এর কৌতূহল অনেক সময়ই যাদের নিয়ে যায় ভুল পথে। এ কারণে সচেতনতা বেশি জরুরি। ভুল তথ্য প্রচার বা গুজব রটানো উল্টো এই গেমটির প্রচারণায় বেশি সাহায্য করবে। ফলে, সঠিক তথ্য জেনে রাখাটাই বেশি দরকার।
ব্লু হোয়েল গেম খেলে হলিক্রসের একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে—এমন একটি গুঞ্জনের কারণে ফেসবুক বেশ সরগরম। বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকাও এমন খবর দিয়েছে। যদিও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আহমেদ জায়িফ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ব্লু হোয়েল গেমস খেলে হলিক্রসের মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলে যে খবর চাউর হয়েছে, তার এখন পর্যন্ত কোনো ভিত্তি নেই। মেয়েটার শরীরে ব্লু হোয়েলের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার আত্মহত্যার ধরনটিও আরও আট-দশটা আত্মহত্যার ঘটনার মতোই। মেয়েটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাঁরা তাকে ভয়ানক রকম নজরদারির মধ্যে রেখেছিলেন। অহেতুক সন্দেহ করতেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বের বড় ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় হয়তো ঘটনাটি ঘটেছে। কে জানে, বাবা-মাও হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারছেন। কিন্তু এখন ব্লু হোয়েল গেমে সান্ত্বনা খুঁজছেন!’
ঘাতক এই গেমের কারণে অবশ্য বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই একটি আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ভারতীয় প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে গড়া বেঞ্চ সেই মামলা পরিচালনা করছেন। আইনজীবী সি আর জয় সুকিন আরজি জানান, অনলাইনে যেন এই গেম পাওয়া না যায় এবং এই গেমের খেলার ওপর সরকার যেন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ, এই গেমটি মানুষকে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি এমন কিছু ডেয়ার বা চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে, যা পরে খেলোয়াড়ের আত্মহত্যায় পরিণতি নেয়।
বাংলাদেশেও পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। এ রকম ঘৃণ্য একটি গেমের নেশায় যেন কিছুতেই না পড়ে এ দেশের শিশু-কিশোর কিংবা তরুণেরা। পারিবারিক ও বন্ধু মহলে সচেতনতা তৈরি জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি তরফেও উদ্যোগ জরুরি। এ গেম যেন কিছুতেই পাওয়া না যায় বাংলাদেশে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৌতূহলে কোনো ধরনের নেশার ফাঁদে পা দেওয়া মস্ত বড় ভুল। সেটা গেমের নেশাও হতে পারে।
সুচিকিৎসা ও স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন
চিকুনগুনিয়ার এক রোগীর জন্য অর্ধডজন ডিগ্রিধারী একজন চিকিৎসক একটি প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন। রোগীর এক আত্মীয় প্রেসক্রিপশনটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘দেখুন তো স্যার, প্রেসক্রিপশনে কী কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং ওষুধগুলো ঠিক আছে কি না?’ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, প্রেসক্রিপশন নিয়ে আমার কাছে কেন এসেছেন? ভদ্রলোক বললেন, ‘চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে সব সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখেন বলে শুনেছি। ’ আর কিছু না বলে প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধগুলোর নাম উদ্ধার করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু রীতিমতো দুঃসাধ্য কর্ম বলে মনে হলো। সেই সনাতন ও চিরাচরিত প্রক্রিয়ায় অপাঠ্য হাতের লেখা। দ্বিতীয় ওষুধটি মনে হলো ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ অর্ধশত উপকরণের ভিটামিন এ টু জেড। প্রথমটি মনে হলো ৬৬৫ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল। এক ওষুধ দোকানদারকে টেলিফোন করে নিশ্চিত হলাম যে আমার ধারণা ঠিক। কিন্তু ৬৬৫ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল বাজারে কেন বা কখন এলো? এটাও কি গরিবের পকেট নিংড়ানোর জন্য ওষুধ কম্পানিগুলোর আরেকটি কূটকৌশল? সে যাক। ভাবছিলাম, জেনেরিক নামে ব্লক লেটার বা প্রিন্ট করার মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন লেখার আদালতের আদেশটি আমাদের চিকিৎসকরা কতটুকু মেনে চলছেন। মেনে চললে এই নামিদামি চিকিৎসক আদালতের নীতিমালা অনুসরণ করে প্রেসক্রিপশনটি লিখলেন না কেন? সন্দেহ হওয়ায় কয়েকটি ওষুধের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানলাম আনুমানিক ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসক আদালতের নির্দেশ মেনে প্রেসক্রিপশন লিখছেন না।
আর সেই কারণে রোগী ও ওষুধ বিক্রেতাদের ভোগান্তিও কমছে না। পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে এ বছরের জানুয়ারির প্রথম দিকে উচ্চ আদালত চিকিৎসকদের ব্লক লেটার বা প্রিন্ট করে জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখতে বিজ্ঞপ্তি প্রচারের জন্য স্বাস্থ্যসচিবের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। নির্দেশে ছয় মাস তদারকির পর আদালতের নির্দেশ মেনে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন লিখছেন কি না, তা আদালতকে জানাতে বলা হয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চিকিৎসকসমাজ আদালতের উল্লিখিত নির্দেশ পুরোপুরি মেনে প্রেসক্রিপশন লিখছেন না। এরই মধ্যে ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসচিব আদালতের কাছে কী প্রতিবেদন পাঠালেন বা পাঠাবেন, তা এখনো জানা যায়নি। একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে চিকিৎসক সমাজের কাছে আমার আবেদন, অনুগ্রহ করে আপনারা আপনাদের চিরাচরিত আচরণ পরিবর্তন করে আদালতের নীতিমালা অনুসরণ করে পরিপূর্ণ তথ্য ও পরামর্শ প্রদানপূর্বক স্পষ্ট ও ঝকঝকে পাঠযোগ্য অক্ষরে জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন লিখুন। চিকিৎসা পেশার নীতিশাস্ত্রেও এই একই নির্দেশনা দেওয়া আছে। সুন্দর ও পাঠযোগ্য প্রেসক্রিপশন লিখলে আপনাদের মানমর্যাদা ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে, মানুষও উপকৃত হবে, অপাঠ্য প্রেসক্রিপশনের ভুল ওষুধ সেবন বা গ্রহণ করে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
ওষুধের অযৌক্তিক প্রয়োগের বড় উৎস হলো চিকিৎসকের রোগ নির্ণয় ও প্রেসক্রিপশন। চিকিৎসক ঠিকমতো রোগ নির্ণয় করে যুক্তিসংগতভাবে ওষুধ প্রদান না করলে রোগী ওষুধের অপব্যবহারজনিত সমস্যার শিকার হবে। চিকিৎসক তাঁর দায়িত্ব সঠিক ও নির্ভুলভাবে পালন করলেও ওষুধের ডিসপেনসিং যুক্তিসংগত বা সঠিক না হলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধ সম্পর্কে রোগীকে পর্যাপ্ত ও প্রকৃত তথ্য, পরামর্শ বা উপদেশ প্রদান করা না হলে যুক্তিহীন ব্যবহারের কারণে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রোগীর জন্য প্রেসক্রিপশনে ওষুধ প্রদানে চিকিৎসক যত সতর্কতা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করবেন রোগী তত বেশি উপকৃত হবে।
রোগ প্রতিকার ও প্রতিরোধে চিকিৎসকদের ভূমিকাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। আমাদের দেশে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে—চিকিৎসক এলে ওষুধ ছাড়াই রোগীর অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। এর পেছনে বৈজ্ঞানিক সত্য রয়েছে। কারণ রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় শরীর ও মনের যোগসূত্র অভিন্ন। উন্নত বিশ্বে প্রকৃত চিকিৎসা শুরুর আগেই চিকিৎসকরা প্রায়ই রোগীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নেন। রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য প্রদান এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অবহিত করতে চিকিৎসকরা সদা সচেষ্ট থাকেন। এতে রোগীর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। রোগী সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ন্যায়সংগত তথ্য জানার জন্য চিকিৎসককে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে। ফলে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রয়োগে ভুল কম হয় বলে ওষুধের অপব্যবহারও কমে আসে। কিন্তু আমাদের দেশে চিকিৎসককে একটির বেশি দুটি প্রশ্ন করলেই তাঁরা বিরক্ত হন ও খেপে যান। কারণ বেশি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তাঁদের নেই। এই আচরণ প্রশংসনীয় নয়। রোগীর প্রতি একটু সদয় ও সহানুভূতিশীল হলে রোগীর আস্থা অনেক বেড়ে যায়, রোগী খুশিও হয়। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকরা তাঁদের প্রেসক্রিপশনে যেসব ওষুধ লিখে থাকেন তার সবই যুক্তিসংগতভাবে লেখেন না। ওষুধের এই অযৌক্তিক প্রয়োগের পেছনে বহুবিধ কারণ কাজ করে। বহু চিকিৎসক পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে রোগীকে সঠিক ওষুধ প্রদানে সক্ষম হন না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব চিকিৎসক নিজেদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন না। এসব চিকিৎসক সাধারণত সনাতনি পদ্ধতিতে যুগ যুগ ধরে সেকেলে মানসিকতা নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যান বলে রোগ নির্ণয় বা ওষুধ প্রদানে প্রায়ই ভুল হয়। আমাদের মতো দেশে অতিমাত্রায় ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে রোগীর প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে না পেরে চিকিৎসকরা অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে রোগীকে সঠিক চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে বহু চিকিৎসক ওষুধ কম্পানি কর্তৃক প্রভাবান্বিত ও প্রলুব্ধ হয়ে গুণগত, মানসম্পন্ন ও সস্তা ওষুধের পরিবর্তে দামি ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন। আবার অনেক চিকিৎসক দেশে উৎপাদিত মানসম্পন্ন ওষুধ বাদ দিয়ে বিদেশি দামি ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। এতে রোগীর আর্থিক ক্ষতি হয়। ওষুধ কম্পানিগুলো ওষুধ বাজারজাত করার পর ওষুধ প্রমোশনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকে তাদের ওষুধের কাটতি বাড়ানোর জন্য। ওষুধের কাটতি বাড়ানোর জন্য ওষুধ কম্পানিগুলোর মূল টার্গেট চিকিৎসক। কারণ চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধ লেখেন, রোগী মূলত সেই ওষুধই কিনে থাকে। অধিক হারে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ওষুধ কম্পানিগুলো সাধারণত টনিক, ভিটামিন, হজমিকারক, বলবৃদ্ধিকারক, এনজাইম, কফমিকচার, অ্যালকালাইজারজাতীয় অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ উৎপাদনে বেশি তৎপর থাকে। কারণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের চেয়ে এসব তথাকথিত ওষুধের ওপর মুনাফার হার বহুগুণ বেশি। এ মুনাফার হার আরো অধিক গুণে বেড়ে যায় যখন চিকিৎসকরা তাঁদের প্রেসক্রিপশনে এসব ওষুধ নামধারী পণ্য নির্বিচারে প্রেসক্রাইব করে থাকেন। ওষুধ কম্পানির সঙ্গে এসব ওষুধ প্রেসক্রাইবারের সম্পর্ক যতটা না পেশাগত, তার চেয়ে বেশি ব্যবসায়িক। ব্রিটেনে চিকিৎসকপিছু ওষুধ কম্পানিগুলো প্রতিবছর দুই লাখ টাকা ব্যয় করে। বাংলাদেশে এই ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ কত তা কে জানে! ঔষধ প্রশাসনের এক সাবেক পরিচালকের তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশের ওষুধ কম্পানিগুলো তাদের মোট বিক্রির ১০ শতাংশ অর্থ চিকিৎসকদের কমিশন দেওয়া বাবদ ব্যয় করে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ওষুধ কম্পানিগুলোর মোট ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মোট বিক্রির ১০ শতাংশ হিসাবে প্রদত্ত কমিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি টাকা। চিকিৎসকদের বিভিন্নভাবে কমিশন দেয় ওষুধ কম্পানিগুলো। মজার ব্যাপার হলো, চিকিৎসকরা ওষুধ কম্পানি থেকে কমিশন পেলেও ওষুধ কম্পানিগুলো কমিশন বাবদ প্রদত্ত সব টাকা তুলে নেয় মানুষের পকেট থেকে। চিকিৎসকরা শুধু ওষুধ কম্পানি থেকেই কমিশন নেন না। তাঁরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন পেয়ে থাকেন। আর এ কারণেই প্রায় সব চিকিৎসক রোগীকে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো ডায়াগনস্টিক টেস্টের পেছনে অসহায় দরিদ্র রোগীদের হাজার হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, চিকিৎসকদের এ ধরনের অনৈতিক কমিশন বাণিজ্যের কারণে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে ঢালাওভাবে সব চিকিৎসকের প্রতি এ ধরনের অভিযোগ প্রযোজ্য নয়। আমাদের দেশে অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁরা এই কমিশন বাণিজ্যকে সম্পূর্ণ অনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁরা কোনো কমিশন নেন না।
অর্থ ছাড়াও ওষুধ কম্পানিগুলো চিকিৎসকদের প্রচুর পরিমাণে ওষুধ ফ্রি স্যাম্পল হিসেবে উপহার দিয়ে থাকে। অভিজ্ঞ মহল মনে করে, এই ফ্রি স্যাম্পল আর ঘুষের মধ্যে পার্থক্য অতি নগণ্য। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, চিকিৎসকরা এই ফ্রি স্যাম্পল কেন গ্রহণ করেন বা এই ওষুধ নিয়েই বা তাঁরা কী করেন? এভাবে ফ্রি স্যাম্পল নেওয়া বা দেওয়া নীতিগতভাবে বৈধ হতে পারে না। আমি অসংখ্য ওষুধের দোকানকে জানি, যেখানে হাজার হাজার টাকার ফ্রি স্যাম্পল হিসেবে পাওয়া ওষুধ বিক্রি হয়। এসব ফ্রি স্যাম্পল না নিলে চিকিৎসকদের কী এমন ক্ষতি হয়।
তৃতীয় বিশ্বেও সব দেশের মতো আমাদের দেশেও সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক, সিডেটিভ, অ্যান্টিডায়ারিয়াল, ভিটামিন, টনিক, এনজাইম, কফমিকচার, স্টেরয়েড, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যান্টিকোলেস্টেরল, অ্যান্টাসিডজাতীয়ওষুধ। টনিক ভিটামিনের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম দুর্বলতা রয়েছে। এ দুর্বলতার কারণ ওষুধ কম্পানিগুলোর অনৈতিক ড্রাগ প্রমোশন এবং চিকিৎসক কর্তৃক এসব ওষুধের ঢালাও প্রয়োগ। টনিক ও ভিটামিন সম্পর্কে ওষুধ কম্পানিগুলো যেসব ভ্রান্ত ধারণা চিকিৎসক ও জনসমক্ষে তুলে ধরে তার মধ্যে রয়েছে, টনিক ও ভিটামিন সেবনে ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধার, বয়স্কদের যৌবনপ্রাপ্তি, শিশুদের মেধা ও বয়োবৃদ্ধি, ত্বকের শ্রীবৃদ্ধি, চুল পড়া বন্ধ হওয়া ইত্যাদি। এসব বক্তব্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও বহু চিকিৎসক প্রায়ই এসব বস্তু প্রেসক্রিপশনে লিখে থাকেন। রোগী প্রয়োজনীয় মনে করে প্রচুর অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে এসব ওষুধ কিনে থাকে। এ অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার স্পষ্টতই প্রবঞ্চনার শামিল।
ওষুধের অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহারের ফলে রোগী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রেসক্রিপশনে প্রদত্ত ওষুধের কোনটি প্রয়োজনীয়, কোনটি অপ্রয়োজনীয় বা প্রদত্ত ওষুধের সঙ্গে সৃষ্ট রোগের আদৌ সম্পর্ক রয়েছে কি না, এসব প্রশ্ন উপস্থাপন করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা রোগীরা সচরাচর রাখে না। ফলে রোগী প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ওষুধ কিনতে ও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। প্রেসক্রিপশন মোতাবেক অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনলে রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপ্রাসঙ্গিক বা ক্ষতিকর ওষুধ কিনতে গেলে রোগী মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়। এ ক্ষতির দায়দায়িত্ব থেকে চিকিৎসক অব্যাহতি পেতে পারেন না। উন্নত বিশ্বে রোগী চিকিৎসকের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। অনুন্নত দেশে রোগী এ সুবিধা বা অধিকার ভোগ করে না। বাংলাদেশে ড্রাগ প্রমোশনে কম্পানিগুলো মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বা ড্রাগ প্রমোশন প্রতিনিধি নিয়োগ করে থাকে। এই রিপ্রেজেন্টেটিভরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ বিশেষজ্ঞ নন এবং কোনো কোনো সময় ওষুধের ওপর তাঁদের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকে না। তাঁদের কোনো কোনো সময় ড্রাগ প্রমোশনের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু ড্রাগ প্রমোশনের জন্য ওষুধ কম্পানি কর্তৃক পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ কতটুকু নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত তথ্যসাপেক্ষ তা মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁরা সাধারণত কম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থটাকে বড় করে দেখেন এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসককে ওষুধ প্রয়োগ ও ড্রাগ স্টোরগুলোকে ওষুধ কিনতে প্রলুব্ধ করেন। প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো রোগের ক্ষেত্রে ওষুধ নির্বাচনে প্রকৃত তথ্য না পেলে চিকিৎসক বিভ্রান্ত হন এবং ভুল বা ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগের ফলে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধির ভিত্তিতে ওষুধ প্রেসক্রাইব করা উচিত। অন্যদিকে ওষুধ কম্পানিগুলো কর্তৃক চিকিৎসক এবং রোগীর জন্য প্রকৃত ও পর্যাপ্ত তথ্যপ্রবাহের নিশ্চয়তা বিধান করার ব্যাপারে সরকারেরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বর্তমানে ওষুধের জোয়ারে আমাদের চিকিৎসকরা ভাসছেন আর এত সব ওষুধের ওপর প্রকৃত তথ্য অন্বেষণে হিমশিম খাচ্ছেন। কোনো দেশে ওষুধের সংখ্যায় সীমাবদ্ধতা না থাকলে এবং বাজার প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধে প্লাবিত হয়ে গেলে সব ওষুধের ওপর সম্যক ধারণা অর্জন কোনো চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব নয়। সুচিকিৎসার জন্য সীমাবদ্ধ ওষুধের ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞান অসংখ্য ওষুধের ওপর অপূর্ণ ও ভাসা ভাসা জ্ঞানের চেয়ে অনেক উপকারী। ওষুধের ফলপ্রসূ ও যুক্তিসংগত প্রয়োগের জন্য কম্পানি প্রদত্ত নামের পরিবর্তে ওষুধের জেনেরিক নাম ব্যবহার আবশ্যক। এ ব্যাপারেও আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু সেই নির্দেশও বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক জেনেরিক নামে ওষুধ লিখে থাকেন। প্রেসক্রিপশন লেখার ব্যাপারেও তাঁরা যত্নবান। এসব হাসপাতালে প্রেসক্রিপশন লেখার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাঁদের আমি সাধুবাদ জানাই। আরো একটি কথা, প্রতিটি দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিকল্পে একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থাকা প্রয়োজন এবং সুচিকিৎসার স্বার্থে চিকিৎসকদের জন্য থাকা প্রয়োজন একটি স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন। বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত দেশের নিরীহ জনসাধারণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে এসব ইনস্ট্রুমেন্টের কোনো বিকল্প নেই। এটা শুধু আমার কথা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তা-ই মনে করে।
পরিশেষে একটি কথা। মানবসেবায় চিকিৎসকদের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মানুষ রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসকের কাছে যায়, চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করে রোগীকে ওষুধ দেন এবং রোগী সেই ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে। রোগীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য মানুষের কাছে চিকিৎসকদের সম্মান ও মানমর্যাদা অনেক বেশি। তাই আমাদের মতো গরিব দেশের অসহায়, দরিদ্র রোগী ও মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অসহায়ত্ব, অভাব-অনটন ও দুর্দশার কথা চিকিৎসক না ভাবলে, না বুঝলে আর ভালো কে ভাববে বা বুঝবে?
মুনীরউদ্দিন আহমদ
অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
drmuniruddin@gmail.com


