রমজান মাসের ফজিলত

সময় জীবনেরই অংশ। সে হিসেবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার পরও কোনো কোনো বছর, বিশেষ কোনো মাস বা দিন এবং কিছু কিছু সময়, এমন থাকে যাকে বিশেষভাবে পালন না করে পারা যায় না। জীবনকে জাগিয়ে তুলতেই সেটা করতে হয়। রমজান তেমনই একটি মাস, যাকে বিশেষভাবে পালনেই মুমিনের ইমানের পরিপূর্ণতা। পার্থিব জীবনের আসল উদ্দেশ্য, আমলনামাকে নেকি দিয়ে ভরে তুলতে পুরো রমজান মাসকে ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করাটা মুমিনের কাছে তাঁর ইমানের দাবি।

মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, আর কিয়ামতের দিন আমলনামা পরিমাপের বিষয়টি নিরেট সত্য। সুতরাং যার নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে, সে হবে বিজয়ী। আর যাদের নেক আমলের পাল্লা কমে যাবে, তারা হলো ওই সমস্ত লোক, যারা আমার আয়াতগুলোকে যথাযথভাবে গ্রহণ না করে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। (সুরা আল-আরাফ : ৮-৯) 
নেক আমলের দ্বারা খুব সহজে আমলনামাকে পূর্ণ করার এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে এসেছে রমজান মাস।

রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যখন রমজান মাস আরম্ভ হয়, তখন রহমতের দ্বারগুলো খুলে দেওয়া হয় আর জাহান্নামের দ্বারগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের বন্দি করে রাখা হয়।" (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস : ৩২৭৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০৭৯, মুআত্তা ইমাম মালেক, হাদিস : ১১০১, মুসান্নেফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৩৮৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৭৭৬৭) 

মাহে রমজানের ফজিলত বর্ণনায় হজরত সালমান ফারসি (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "একবার শাবান মাসের শেষ দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সম্মোধন করে একটি খুতবা দিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের ওপর একটি মহান মাস ছায়া বিস্তার করতে চলেছে, একটি বরকতময় মাস। মাসটির মধ্যে এমন একটি রাত রয়েছে, যার মর্যাদা এক হাজার মাস অপেক্ষা অধিক। আল্লাহতায়ালা এ মাসে দিনে রোজা রাখাকে ফরজ করেছেন আর রাতে কিয়াম করাকে, অর্থাৎ তারাবির নামাজ আদায় করাকে করেছেন ঐচ্ছিক। যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, এর দ্বারা তার পাপ মার্জনা করা হবে এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। আর রোজাদারের সমপরিমাণ নেকি তাকে দান করা হবে অথচ রোজাদারের প্রাপ্য নেকি একটুও কমানো হবে না।" 

সাহাবাগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সকলের তো রোজাদারকে ইফতার করানোর মতো সংগতি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে কেউ কোনো রোজাদারকে একটি মাত্র খেজুর দিয়ে বা পানি পান করিয়ে অথবা এক ঢোক দুধ দিয়ে ইফতার করাবে, মহান আল্লাহ তাকে এই নেকি দান করবেন। আর যে কোনো রোজাদারকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, মহান আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন আমার হাউস থেকে এমন শরবত পান করাবেন যে জান্নাতে প্রবেশের আগে তার আর পিপাসা লাগবেনা। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস : ১৮৮৭, বায়হাকী, শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৩৩৬, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হাদিস : ১৭৫৩)


হজরত সালমান ফারসি (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসকে মুমিনের জন্য ছায়া ও বরকত বলে উল্লেখ করেছেন। ছায়া বলতে আশ্রয়স্থল উদ্দেশ্য করা হয়েছে। একজন পথিক যেমন পথ চলতে চলতে ক্লান্ত-শ্রান্ত-দুর্বল হয়ে পড়লে কোনো গাছের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। কিছুক্ষণ সেখানে বিশ্রাম নিয়ে সে তার হারানো শক্তি ফিরে পায়। আবার পথ চলতে শুরু করে এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। তেমনি মুমিন বান্দা এগারো মাস নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায়, শয়তানের প্রতারণায় এবং পার্থিব মোহে পাপাচার করে নিজের ইমানি শক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। মাহে রমজানে মুমিন তার অতীতের সমুদয় গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করে নেবে এবং নিবিড়ভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার মাধ্যমে হারানো ইমানি শক্তি ফিরে পেয়ে মহান আল্লাহর প্রিয় হয়ে উঠবে। 
আলোচ্য উপমার মাধ্যমে মহানবী (সা.) সে কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন। মহান আল্লাহ সকল মুসলমানকে সে উদ্দেশ্যে কবুল করুন।



মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ 
পেশ ইমাম, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

No comments:

Post a Comment