তেওতা জমিদারবাড়ি: নজরুলের স্মৃতিবিজ‌রিত স্পট

মানিকগঞ্জের পুরাকীর্তি স্থাপনার মধ্যে শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ীর ইতিহাস বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর কূলঘেঁষা সবুজ-শ্যামল গাছপালায় ঢাকা তেওতা গ্রামটিকে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে দিয়েছে জমিদার শ্যামশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত নবরত্ন মঠটি। একসময়ে জমিদারের বাড়ির আঙিনার এই মঠকে ঘিরে দোলপূজা আর দুর্গাপূজার রঙিন উৎসব পালিত হতো। মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার এই তেওতা গ্রামটিতে জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে । ঢাকার থেকে কাছের দূরত্বে যেকেউ ঘুরে আসতে পারেন নজরুলের স্মৃতিধন্য তেওতা জমিদারবাড়িতে ।

ইতিহাস
ইতিহাসবিদদের মতে, সতেরশ' শতকে এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চানন সেন নামক একজন জমিদার। জনশ্রুতি অনুসারে, পঞ্চানন সেন এক সময় খুবই দরিদ্র ছিলেন ও দিনাজপুর অঞ্চলে তিনি তামাক উৎপাদন করে প্রচুর ধসম্পত্তির মালিক হওয়ার পর এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তিতে এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠিত করে জয়শংকর ও হেমশংকর নাম দুজন ব্যক্তি।
ভারত বিভক্তির পর তারা দুজনেই ভারত চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

বি‌দ্রোহী নজরুল কয়েক দফায় এসেছিলেন এই গ্রামে। তবে জনশ্রুতি হয়েছে ১৯২২ সালে প্রমীলার সঙ্গে একবার এসেছিলেন ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে নজরুলের লেখা ‘‘আনন্দময়ীর আগমনে’’ কবিতাটি ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশ হলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। প্রমীলাকে নিয়ে তেওতা গ্রামে আত্মগোপন করেন নজরুল। আত্মগোপনে থাকতে এলেও দুরন্ত নজরুল অবশ্য ঘরের কোণে বসে থাকেননি।
যমুনার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা সবুজ শ্যামল পাখিডাকা তেওতা গ্রামে ছুটে বেরিয়েছেন। গান, কবিতা আর অট্টহাসিতে পুরো গ্রামের মানুষকে আনন্দে মাতিয়েছেন। কখনো বা জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে রাতের বেলায় করুণ সুরে বাঁশি বাজিয়ে বিমোহিত করেছেন রাতজাগা গ্রামের মানুষকে। জমিদার কিরণশঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে একবার নজরুল তাঁর অতিথি হয়ে আসেন। আর সে সময়ই নজরুল এবং প্রমীলার দেখা হয়েছিল। জমিদারবাড়ীর পাশের বাড়ি বসন্তকুমারের মেয়ে দুলি (প্রমীলা) ছিলেন তখনকার জমিদার কিরণ শঙ্কর রায়ের স্নেহধন্য। বেড়াতে এসে নজরুল জমিদারবাড়িতে প্রতি রাতেই গান-বাজনার আসর বসাতেন। আর সেখানে একমাত্র গায়ক ছিলেন নজরুল। দুলি তখন মাত্র কয়েক বছরের বালিকা। নজরুল গানের ফাঁকে ফাঁকে পান খেতেন। আর দুলির দায়িত্ব ছিল তার হাতে পান তুলে দেওয়া। হয়তো এর মাধ্যমেই নজরুল প্রমীলার পরিচয় আরো ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। বিয়ের পর তেওতার জমিদার কিরণ শঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে নজরুল নববধূকে নিয়ে আবার তেওতায় আসেন। প্রায় দুই সপ্তাহ থাকার সময় জমিদার বাড়িতে নজরুলের গান ও কবিতার আসর বসত। দর্শকের আসনে জমিদার পরিবারের পাশে প্রমীলাও থাকতেন। আর নজরুল যখন
‘‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ"....
অথবা, "মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল".... গান গাইতেন তখন লজ্জায় রক্তিম হতেন প্রমীলা। ভবঘুরে জীবনে নজরুল যেখানেই গেছেন সেখানেই তিনি কিছু না কিছু রচনা করেছেন। তেওতার স্মৃতি নিয়েও তিনি অনেক কবিতা গান সৃষ্টি করেছেন বলে নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলামের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। এমনই একটি হচ্ছে নজরুলের ‘‘লিচু চোর কবিতা’’। তেওতার জমিদারদের স্থানীয়ভাবে বলা হতো বাবু। আর তাদের বিশাল পুকুর ঘিরে তালগাছ থাকায় বলা হতো তালপুকুর। প্রাচীর ডিঙিয়ে এই পুকুরপাড়ের গাছ থেকে একটি বালক লিচু চুরি করতে গিয়ে মালি ও কুকুরের তাড়া খাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নজরুল এই কবিতাটি রচনা করেছিলেন।

দেখার আ‌ছে অ‌নেক কিছুই
তেওতা জমিদার বাড়িটি মোট ৭.৩৮ একর জমি নিয়ে স্থাপিত। মূল প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে আরও বিভিন্ন ধরণের স্থাপনা ও একটি বড় পুকুর। প্রাসাদের মূল ভবনটি লালদিঘী ভবন নামে পরিচিত। এখানে একটি নটমন্দিরও রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে নবরত্ন মঠ ও আর বেশ কয়েকটি মঠ। সবগুলো ভবন মিলিয়ে এখানে মোট কক্ষ রয়েছে ৫৫টি।

জমিদার বাড়িটি এখনো তার কাঠামোতে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও খয়ে গেছে এর ইটের দেয়াল। বাড়ির সামনে বিশাল একটি পুকুর এই পুকুরের জল তরঙ্গে পুরো রাজবাড়ির অবয়ব দর্শন করা যায়। বাড়ির সামনে আছে একটি বহুতল মন্দির। কারুকাজময় মন্দিরটি আজ বিলীন হওয়ার পথে। এখনো যেটুকু সৌন্দর্য অবশিষ্ট রয়েছে তার আকর্ষণও কম নয়। ভবনের এক পাশে দোতালায় ওঠার সিঁড়ির দেখা পাবেন। ছাদ থেকে পুরোবাড়ির গঠন কাঠামো দেখতে পাবেন অসাধারণ কারুকার্য খচিত। বাড়ির সামনে মাঠের কোণায় দেখা পাবেন কূয়ার। বাড়ির সামনেই আছে সবুজ ঘাসের বড়সড় মাঠ। মাঠেই রয়েছে জমিদারদের তৈরি টিনের চালার এক কাচারিবাড়ি। এখানে সেখানে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে।

যেভাবে যাবেন
কয়েকটি পথ ধরে আপনি যেতে পারবেন তেওতা রাজবাড়ি। ঢাকা থেকে আরিচার দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। তিন ঘণ্টায় বাসে যেতে ভাড়া দিতে হবে ৮০-১০০ টাকা। গাবতলী থেকে যাত্রীসেবা, বিআরটিসি, পদ্মা লাইন, ইত্যাদি বাসে আরিচাঘাট যেতে পারবেন। আরিচা ঘাট থেকে রিকশায় ২৫-৩০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যাবে তেওতা জমিদার বাড়ি। অথবা ঢাকা থেকে বাসে আরিচা ঘাট এসে নামতে হবে। এরপর সিএনজিচালিত অটো অথবা রিকশা যোগে তেওতা যেতে হবে। এ ছাড়া নদীপথেও আসা যাবে। এজন্য নৌকায় আরিচাঘাটে এসে নামতে হবে। যমুনা নদী দিয়ে বাংলাদেশের যেকোনো পয়েন্ট থেকে তেওতা জমিদারবাড়ী আসা যাবে। মাইক্রোবাস ভাড়া করেও যেতে পারবেন- ভাড়া নেবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।

No comments:

Post a Comment