অশ্বত্থে দূর করুন বি‌ভিন্ন রোগ

অশ্বত্থ আসলে এক প্রকার বট বা ডুমুর জাতীয় বৃক্ষ। এর অন্য নাম অশথ বা পিপল। বৈজ্ঞানিক নাম Ficus religiosa যাকে ইংরেজিতে 'sacred fig' বা 'holy tree' বলা হয়। এ জাতীয় বৃক্ষের আদি নিবাস বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, মায়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, দক্ষিণ পশ্চিম চীন এবং ইন্দোচীন। একে বোধিবৃক্ষও বলা হয়। সংস্কৃত ভাষায় 'বোধি' শব্দের অর্থ 'জ্ঞান'; এই শব্দটি শ্রীলঙ্কায় বিবর্তিত হয়ে 'বো' শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে। গৌতম বুদ্ধ এই গাছের নিচেই ধ্যানমগ্ন ছিলেন এবং বোধিলাভ করেন।
অশ্বত্থ বা পিপল গাছ ৩০ মিটার লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ডের বেড় ৩ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফুলগুলো ফলের ভেতরে লুকানো থাকে, পাতাগুলো পান পাতার আকৃতির যার ডগা লেজের মতো টানা এবং শেষদিকে সরু। অশ্বথের পাতা ১০-১৭ সেমি লম্বা এবং ৮-১২ সেমি চওড়া। শীতকালে এর পাতা ঝরে যায়, বসন্তে তামাটে রঙের কচি পাতা গজায়। পিপল ফল ডুমুরের মতোই তবে পাকা ফল বেগুনি রঙের; কাচা ফল সবুজ; ফলের আকার ১-১.৫ সেমি। এই গাছতলায় অল্প বাতাসেও ঝমঝম আওয়াজ শোনা যায়। গাছ জুড়ে ছেয়ে থাকা ঘন পাতার লেজের দিকের সঙ্গে মূলপাতার ফলকের ঘর্ষণেই এমন শব্দ হয়। গ্রীষ্মের দুপুরে হাল্কা বাতাসেও তাই অশ্বত্থ তলায় শান্তির পরশ বয়ে যায়- সঙ্গে থাকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। বটের মতো এই বৃক্ষের ঝুরিমূল থাকে না। এই গাছ দু’হাজার বছরেরও বেশি বেঁচে থাকতে পারে। এর বনসাই সৌখিন বৃক্ষপ্রেমিদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

এটা হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য গাছের চেয়ে বেশি অক্সিজেন সরবরাহ করে অশ্বত্থ গাছ। কারও কারও মতে, এই গাছের জন্যই আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অঢেল অক্সিজেন পাচ্ছি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, পিপল বা অশ্বথে অমৃত তত্ত্ব বা পদার্থ রয়েছে। পুরাকালে এই গাছকে দেবতাদের নিবাস স্থান বলে মনে করা হতো। আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ বাদ দিলেও পিপল গাছের শেকড় থেকে শুরু করে এর পাতা, ছাল ইত্যাদি প্রায় সবই ঔষধি হিসাবে বিশেষভাবে কাজে লাগে। এগুলো বিভিন্ন রোগ নিবারণে ব্যবহার হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে। আয়ুর্বেদিক নানা গ্রন্থে পিপলের বহুবিধ ঔষধি গুণের উল্লেখ রয়েছে।

অশ্বত্থ এমন এক গাছ যা ২৪ ঘণ্টাই অক্সিজেন দেয়। এই গাছ আশপাশে একটু খোঁজ করলেই চোখে পড়ে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে বেশ কিছু ঔষধে অশ্বত্থের পাতা ব্যবহার করা হয়। শাস্ত্রমতে, কয়েক ধরনের হৃদরোগে অশ্বত্থের পাতা, ফল, ফুল, ছাল ও শেকড় বেশ কাজে দেয়।
সচরাচর দেখা দেয় এমন কিছু রোগ ও স্বাস্থ্যসমস্যায় অশ্বথ গাছের কিছু ব্যবহার এখানে দেওয়া হলো-
১) হৃৎপিণ্ডের জন্য: গোটা ১৫ অশ্বত্থের পাতা একটি পাতিলে নিয়ে সেদ্ধ করুন। পানি শুকিয়ে তিন ভাগের একভাগ হলে চুলা থেকে নামান। এবার এর ক্কাথগুলো তিন ভাগ করুন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে তিন ঘণ্টা পরপর দৈনিক তিনবার পান করুন এই তরল। কয়েকদিন চালিয়ে যান। এটা আপনার হৃদপিণ্ডকে মজবুত করবে এবং বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগ প্রতিরোধ করবে।

২) স্মরণশক্তি: অশ্বত্থের পাকা ফল স্মরণশক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
কবিরাজি (আয়ুর্বেদ) চিকিৎসা মতে প্রতিদিন পাঁচটি করে অশ্বথের পাকা ফল গ্রহণ স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে। এটা শরীরকেও সুপুষ্ট, মজবুত করে।
৩) দাঁত ব্যাথা: দাঁত পরিষ্কার ও মজবুত করার জন্য এর শাখা থেকে বানানো মেসওয়াক ব্যবহার করুন। এই দাঁতন দন্তব্যথাও দূর করে থাকে। অশ্বথের কচি পাতা গোলমরিচের সঙ্গে বেটে মটরের দানার মতো ছোট ছোট গুটি তৈরি করে নিন। দাঁত ব্যথা দেখা দিলে এমনি একটা গুটি বা বড়ি ব্যথাযুক্ত দাঁতের নিচে কিছুক্ষণ চেপে রাখলে দাঁত ব্যাথা সেরে যায়।
৪) অস্বাভাবিক মাত্রায় অশ্রু: যদি চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ে তাহলে অশ্বথের কয়েকটি কচি পাতা বা ৫টি মুকুল নিয়ে এক বাটি পানিতে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই পানি দিয়ে চোখ পরিষ্কার করলে অশ্রুঝরা বন্ধ এছাড়া কচি পাতার রসে বা মুকুলের রসে বিশুদ্ধ মধু মিশিয়ে কাঠি দিয়ে চোখে প্রতিদিন কাজল পাড়ার মতো লাগালে চোখের লাল ভাব বা জ্বালা দূর হয়।
৫) কৃমি: অশ্বথের পঞ্চাঙ্গ চূর্ণ এবং গুড় সমান মাত্রায় মিশিয়ে মৌরির আরকের সঙ্গে দিনে ২ বার সেবন করলে পেটের কৃমি মরে যায়। ছোট শিশুদের পক্ষে এটি দ্রুত ফলপ্রদ ঔষধি।

৬) কোষ্ঠকাঠিন্য: কখনো কখনো অন্ত্রের মধ্যে থাকা জল শুকাতে শুরু করে, যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। এমন অবস্থায় সমাধান দেবে এই গাছ। অশ্বথের পাতা ছায়ায় শুকিয়ে চূর্ণ করে তাতে গুড় মিশিয়ে ছোট ছোট গুলি/বড়ি তৈরি করে নিন। কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে রাতে শোওয়ার আগে ২টি করে বড়ি হালকা গরম দুধের সঙ্গে সেবন করুন। দ্রুত আরাম হবে এবং পেট খোলাসা হয়ে দাস্ত হবে।
৭) গর্ভধারণ: যারা স্বাভাবিক গর্ভধারণে জটিলতার মুখে পড়ছেন তারা পিপল বা অশ্বথের শুকনো ফল থেকে উপকার পেতে পারেন। এই ফল শুকনো অবস্থায় সংগ্রহ করে থেঁতো বা গুঁড়ো করে চূর্ণ করে নিন এবং কাপড়ে ছেঁকে নিন। যে সমস্ত নারী নিঃসন্তান তাদের এই চূর্ণ ৫ গ্রাম মাত্রায় এক গ্লাস হালকা গরম দুধ (খাঁটি) সহযোগে কয়েক মাস নিয়মিত সেবন করালে একপর্যায়ে অবশ্যই গর্ভধারণ হবে। শুধুমাত্র ঋতুস্রাবের দিনগুলিতে এই ওষুধ সেবন বন্ধ রাখতে হবে।

৮) শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি: উপুর্যপরি শ্বাস পড়তে শুরু করলে বা হাঁপানির টান শুরু হলে অশ্বথের শুকনো ছালের চূর্ণ ৫ গ্রাম মাত্রায় নিয়ে হালকা গরম পানির সঙ্গে দিনে ৩ বার করে সেবন করলে রোগী প্রভূত আরাম বোধ করবে। নিয়মিত ব্যবহারে ধীরে ধীরে রোগও প্রশমিত হবে।
৯) নাক দিয়ে রক্ত পড়া: ৫০ গ্রাম পিপলের দুধ বা আঠাতে সমমাত্রায় মিছরি মিশিয়ে চূর্ণ করে নিন। প্রত্যেক দিন সকালে ৩ গ্রাম করে এই চূর্ণ সেবন করলে শরীরের গরম শান্ত হয় এবং নাক দিয়ে রক্ত পড়া প্রশমিত হয়।
১০) পুরুষদের দুর্বলতা: পুরুষদের বিশেষ করে মধ্যবয়সী পুরুষদের অনেক সময় এই যৌন সমস্যাটি অর্থাৎ শীঘ্রপতন সমস্যা দেখা যায়। এমন হলে প্রথম অবস্থায় পিপল গাছের সাদা রস ১১ ফোঁটা করে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় কিছুর সঙ্গে নিয়মিত কিছুদিন সেবন করলে সমস্যা দূর হয়। নিয়মিত কয়েক মাস এই রস সেবন করলে ভাল ফল মেলে।

No comments:

Post a Comment